Select your Top Menu from wp menus
Last updated: 29/03/2021 at 10:14 PM | আজ বৃহস্পতিবার, ৬ মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২৩ বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৩ রমজান, ১৪৪২ হিজরি
শিরোনাম

ঋণ সংকটে মধ্যবিত্ত, বিদেশে আগ্রহী ধনীরা

ঢাকার মিরপুরে এক হাজার ২০০ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাট কিনতে গড়ে ৪৮-৫০ লাখ টাকা প্রয়োজন। দুই ইউনিটের একটি পাঁচতলা বাড়ি নির্মাণে প্রয়োজন কমপক্ষে দেড় কোটি টাকা। দেশের মধ্য আয়ের মানুষের কাছে এত টাকা নেই যে পুরো টাকা নগদ দিয়ে বাড়ি নির্মাণ করবে বা ফ্ল্যাট কিনবে। এ ক্ষেত্রে বাড়ি নির্মাণে ইচ্ছুকদের বড় ভরসা ছিল বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আবাসন পুনরর্থায়ন স্কিম’। কিন্তু সে ভরসাও এখন আর নেই বললেই চলে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন থেকে ১০-১২% হার সুদে ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে তা পরিশোধ করতে পারতেন বাড়ি নির্মাতারা। অন্যদিকে ‘আবাসন পুনরর্থায়ন স্কিম’ থেকে মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করত বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু চার বছর ধরে ‘আবাসন পুনরর্থায়ন স্কিম’ স্থগিত আছে। আর হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন তীব্র তহবিল সংকটে ভুগছে। ফলে তারা ঋণ দিতে পারছে খুব সামান্য পরিমাণে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষের অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন বাসস্থান নির্মাণে কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা না করা হলে আবাসন খাতে গতি আসবে না। এ খাতে গতি না এলে দেশের ২৬৯টি শিল্প খাতের পণ্যের চাহিদা বাড়বে না।

মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের বিদেশে অর্থপাচারের সুযোগ কম। তারাই দেশের আবাসন খাতের এখন বড় ক্রেতা। তাদের আবাসন চাহিদা পূরণের জন্য ঋণের যোগান দিতে ২০০৭ সালের ১৮ জুলাই একটি পুনরর্থায়ন তহবিল চালু করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০১০ সালের এপ্রিলে আবাসনকে ‘অনুৎপাদনশীল খাত’ উল্লেখ করে এই তহবিল থেকে পুনরর্থায়ন করা বন্ধ করে দেয় সংস্থাটি।

আগে পুনরর্থায়ন তহবিল থেকে একজন আবেদনকারীকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা করে ঋণ দেওয়া হতো। এই টাকা দিয়ে তখন এক হাজার ২৫০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কেনা যেত। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ঋণ বিতরণ করত কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে মাত্র ৫ শতাংশ সুদে এই ঋণ প্রদান করতো। বাণিজ্যিক ব্যাংক গ্রাহকদের কাছ থেকে সুদ নিতো ৯ শতাংশ। ঘূর্ণায়মান এই তহবিলটি ২০০৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৭০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। ২০১০ সালের ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত এই তহবিল থেকে ৬১০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়। ১৪টি ব্যাংক ও ২৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই পুনরর্থায়ন তহবিল থেকে ঋণ নিয়ে গ্রাহকদের দিতো।

অন্যদিকে হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন থেকে গ্রাহকরা বাড়ি নির্মাণের জন্য ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১২ শতাংশ ও এর বাইরের এলাকায় ১০ শতাংশ হার সুদে ঋণ নিতে পারতেন। এ সংস্থাটি তীব্র তহবিল সংকটে আছে। গত বছর তারা সরকারের কাছে ৫০০ কোটি টাকা চাইলেও সরকার তাতে সাড়া দেয়নি।

তবে বাংলাদেশে যে গৃহঋণ নেই, তা নয়। বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে গৃহঋণ নেওয়া যায়। ব্যাংকগুলো ১১ থেকে ১৯.৫০ শতাংশ হারে ঋণ দেয়। কিন্তু এ ঋণের ওপর গ্রাহকের আস্থা কম। তাদের অভিযোগ, নানা রকম প্রকাশ্য ও গোপন চার্জ এবং প্রসেসিং ফির নামে ব্যাংকগুলো সুদের হার ১৬ থেকে ২২ শতাংশে নিয়ে যায়। তাই ‘ঘুষ’ দিয়ে হলেও হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করেন বাড়ি নির্মাতারা।

বিভিন্ন দেশের ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইট ঘেটে দেখা গেছে, মালয়েশিয়ায় গৃহ ঋণের সুদের হার গড়পড়তা ৪.৫ শতাংশ। সেদেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলো ৪.৩৯ থেকে ৪.৬৫ শতাংশ হার সুদে গ্রাহকদের গৃহ ঋণ দেওয়ার অফার দিচ্ছে। সিঙ্গাপুরে গৃহ ঋণের সুদের হার আরও কম। সেখানে গ্রাহকরা বেসরকারি ব্যাংক থেকে ২.৮ থেকে ৩ শতাংশ সুদে ঋণ পেতে পারেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক গড়পড়তা ১০.৫ শতাংশ হার সুদে গৃহ ঋণ দিচ্ছে।

এদিকে, আবার যে ধনীদের হাতে টাকা আছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আস্থা সংকটের কারণে তারা দেশের চেয়ে বিদেশে সম্পদ কিনতেই বেশি আগ্রহী। মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম প্রকল্পই তার বড় প্রমাণ। ২০০২ সালে চালু হওয়া ওই প্রকল্পে দুই হাজার ৯৩৩ জন বাংলাদেশি অংশ নিয়ে সে দেশে কমপক্ষে দুই হাজার কোটি টাকা ‘পাচার’ করেছেন। এটা কেবল ওই প্রকল্পে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজন হয়েছে। সেখানে স্থাবর সম্পত্তি কিনতে কত টাকা বাংলাদেশিরা ব্যয় করেছে, তার হিসাব দেয়নি মালয়েশীয় সরকার। সেকেন্ড হোম প্রকল্পে অংশগ্রহণকারীরা সেখানে স্থাবর সম্পদ কিনতে চাইলে তাদের প্রত্যেককে কমপক্ষে ১০ লাখ রিংগিত বা দুই কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে হবে।

চলতি বছর সুইস ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশিদের তিন হাজার ২৩৬ কোটি টাকা গচ্ছিত আছে। অন্যদিকে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে বছরে ৮০ কোটি ডলার বা ছয় হাজার ২৪০ কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশের অনেকের বিদেশে জমি কেনা, বাড়ি কেনা ও ফ্ল্যাট কেনার খবর প্রায়ই পাওয়া যায়।

এদেশে আবাসন খাতের বড় ক্রেতা ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কিন্তু ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেড়ে যাওয়া তাদের নিরুৎসাহিত করছে। বছর দুয়েক আগে তারা প্রতি ডলারের বিপরীতে ৮৩-৮৪ টাকা পেতেন। এখন পাচ্ছেন ৭৮ টাকার কাছাকাছি।

বাংলাদেশের আবাসন ব্যবসায়ীরা চান, সরকার ‘আবাসন পুনরর্থায়ন স্কিম’টি আবার চালু করুক।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সাধারণ সম্পাদক মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, জমি ও ফ্ল্যাট একটি সম্পদ। এর বিপরীতে ঋণ দিলে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি থাকে না। ফ্ল্যাট বন্ধক রেখে কম সুদে ঋণ দিলে ক্ষতি নেই।

ঋণ দেওয়ার জন্য তহবিল গঠনের দাবিটি সমর্থন করেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনও। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মানুষকে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। সেখান থেকে ক্রেতাদের এক অঙ্কের সুদ হারে ঋণ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি গ্রামে যারা বহুতল ভবন করতে চান তাদেরও এই খাত থেকে ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

গৃহ নির্মাণে গতি আনার জন্য কম সুদের ঋণ প্রয়োজন বলে মনে করেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও।

কাজীপাড়ার রডের দোকান প্রগতি ট্রেডিং অ্যান্ড কোম্পানির মালিক জহিরুল ইসলাম বলেন, বেসরকারি ব্যাংকগুলো যে সুদ হারে ঋণ দেওয়ার কথা বলে, তার চেয়ে অনেক বেশি সুদ নেয়।

তিনি প্রশ্ন করেন, কোনোভাবে কি ঋণের সুদহার এক অঙ্কের ঘরে নিয়ে আসা যায় না?

গত ২৪ এপ্রিল গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে দেখা করে আবাসন খাতকে শিল্প হিসেবে ঘোষণার দাবি করেন রিহ্যাব নেতারা। তাদের মতে, এ খাত শিল্প হিসেবে ঘোষিত হলে নির্মাতারা কম সুদে ঋণসহ বেশ কিছু সুবিধা পাবেন।

সংগঠনটির সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া মিলন বলেন, কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে ফ্ল্যাট বিক্রি বাড়তো। তাতে অবিক্রীত ফ্ল্যাটের সংখ্যা কমে এ শিল্পে কিছুটা গতি ফিরত। নির্মাতারা আবার নতুন প্রকল্প শুরু করতে পারতেন। – See more at: http://www.banglanews24.com/beta/fullnews/bn/333622.html#sthash.hXZi5Ku6.dpuf

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *