Select your Top Menu from wp menus
Last updated: 29/03/2021 at 10:14 PM | আজ বুধবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১ বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১ রমজান, ১৪৪২ হিজরি
শিরোনাম

ক্ষতিপূরণ পায়না দূর্ঘটনায় গার্মেন্টস কর্মীরা

10420330_892788530731814_662805457504731710_n

রেড নিউজ ২৪.কম

বিভিন্ন সময় গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে সংগঠিত দূর্ঘটনায় হতাহত শ্রমিকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোন ক্ষতিপূরণ পায়না। কখনো কখনো ক্রেতা প্রতিষ্ঠান গুলোকে মানবাধিকারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে দূর্ঘটনার শিকার হতভাগ্য শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানালেও বেশিরভাগ বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান তা আমলে নেয়না। রানা প্লাজা দূর্ঘটনায় এখনো বহু শ্রমিক ক্ষতিপূরণ পায়নি। যারা পেয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। গত বছর উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়ে কমিটি গঠন করা হলেও আজও তা অলোর মুখ দেখেনি।

এছাড়া বহু আহত শ্রমিক টাকার অভাবে চিকিৎসা চালাতে না পেরে পঙ্গুত্ব বরণ করছে। একটি পরিসংখ্যানে প্রকাশ করা হয়েছে ১৯৯০ থেকে ২০১৩ ইং সাল পর্যন্ত ২৪ বছরে গার্মেন্টস শিল্পে বিভিন্ন দূর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২১২৯ জন।

ভয়াবহ গার্মেন্টস দূর্ঘটনা গুলোর মধ্যে অন্যতম হল তাজরীন গার্মেন্ট। কারখানাটিতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা দুই বছর পেরিয়ে গেলেও হতাহতদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে বেশিরভাগ বিদেশি পোশাক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। এ অগ্নিকান্ডের ঘটনার দুই বছর পূর্তিতে আজ সোমবার হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার অদূরে সাভারে ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় অন্তত ১১২ পোশাকশ্রমিক নিহত হয়। ওই ঘটনার পর তাজরীনের সঙ্গে ব্যবসায়িকভাবে জড়িত ১৬টি পোশাক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আহ্বান জানানো হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেলজিয়ামের সিএ্যান্ডএ ও হংকংয়ের লিএ্যান্ডফুং নামের দুইটি প্রতিষ্ঠান হতাহতদের স্বজনদের কিছু ক্ষতিপূরণ দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, তারা গত বছরের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিপূরণের জন্য লিখিতভাবে আহ্বান জানায়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ডিকিস, সিয়ারস, ডিজনি ও ওয়ালমার্ট এবং ফ্রান্সের টেডি স্মিথ সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর দেয়নি। এ ছাড়া এডিনবার্গ উলেন মিল (যুক্তরাজ্য), এল কার্তে ইঞ্জেলস (স্পেন), সিন কম্বস/এনিস (যুক্তরাষ্ট্র), কার্ল রেইকার (জার্মানি), কেআইকে (জার্মানি), পিয়াজা ইতালিয়া (ইতালি) সামান্য কিছু ত্রাণ বিতরণ করেছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ সাহায্য প্রদান করার কথা বললেও নির্দিষ্ট কোনো পরিমাণ বা সময়সীমা উল্লেখ করেনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাজরীনে অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে অনেকেই জানিয়েছেন তারা বাংলাদেশ সরকার ও বিজিএমইএর পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। কিন্তু তা তাদের চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয়েই খরচ হয়ে গেছে। বর্তমানে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক কাজ করতে না পারায় তাদের মানবেতর জীবন-যাপন করতে হচ্ছে।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের প্রধান ব্রাড এডামস বলেন, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির মতো তাজরীনের ক্ষতিগ্রস্তদেরও বিপুল পরিমাণ আর্থিক সহায়তা দরকার।ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার বিষয়টিকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।

দেশে বড় দুটি গার্মেন্টস দূর্ঘটনায় পোষাক শিল্পের যে ক্ষতি হয়েছে সে তুলনায় কতটুকু ন্যায ক্ষতিপূরণ ও সঠিক বিচার পেয়েছে ক্ষতিগ্রস্থ পোষাক শ্রমিকরা! বিশ্বব্যাপি অগ্নিকান্ডের সমিকরণে ১৯১১ সালের পর পোশাক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের তালিকায় উঠে আসে ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনের অগ্নিকান্ড। সরকারী হিসেব মতে তাজরীন ফ্যাশনের অগ্নিকান্ডে মৃতের সংখ্যা ১১১ জন ও শত শত শ্রমিক আহত হন সে সময়। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঘটে সাভার ট্রাজেডী। বিশ্বের ইতিহাসে ৩য় বৃহত্তম শিল্প দূর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত ইতিহাস সৃষ্টিকারী রানা প্লাজা ধসে মৃতের সংখ্যা দেড় হাজারেরও বেশি। আহত হয়েছে প্রায় কয়েক হাজার শ্রমিক।

সূত্র বলছে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানার দূর্ঘটনাগুলো এখনও পর্যন্ত কেবল মৃত শ্রমিকের সারিই বড় করছে। একটি পরিসংখ্যানে প্রকাশ করা হয়েছে ১৯৯০ থেকে ২০১৩ ইং সাল পর্যন্ত ২৪ বছরে গার্মেন্টস শিল্পে বিভিন্ন দূর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ২১২৯ জন। ১৯৯০ ঢাকার সারাকা গার্মেন্টসে অগ্নিকান্ডে কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ৩২ জন নিহত হয়, যার মধ্যে ২৫ জনই ছিল নারী ও শিশু। ১৯৯১ সালে গার্মেন্টস কারখানা দূর্ঘটনায় মারা যায় ৫ জন। ১৯৯৩ এ নিহতের সংখ্যা ১২ জন। ১৯৯৪ এ নিহত হয় ৫ জন। ১৯৯৫ মৃত্যুর মিছিলে যোগ হয় ৯টি লাশ। ১৯৯৬ এ ঢাকাস্থ লুসাকা গার্মেন্টসে অগ্নিকান্ডে মারা যায় ২২ জন। ১৯৯৭ এ নারায়নগঞ্জের জাহানারা ফ্যাশন ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকান্ডে প্রাণ হারায় ২০ জন এবং ঢাকাস্থ সাংহাই অ্যাপারান্সে অগ্নিকান্ডে মারা যায় ২৪ জন। ২০০০ সালে ঢাকার ম্যাক্রো সোয়েটারে অগ্নিকান্ডে প্রাণ হারায় ২৪ জন। কারখানাটিতে একই বছরে মোট তিনবার দূর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া অগ্নিকান্ডের শিকার হয়ে রাজধানীর গে¬াব নিটিং এ মারা যায় ১২ জন এবং চৌধুরী নিটওয়্যারে ৫১ জন। ২০০৪ মিরপুরের একটি পোষাক কারখানায় ট্রান্সফরমার ব¬াস্টের শব্দে হুড়োহুড়ি করে বের হতে গিয়ে মারা যায় ৭ জন নারী শ্রমিক। নরসিংদীর চৌধুরী নিটওয়্যারে দূর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ২৩ জনের। ২০০৫ এ নারায়নগঞ্জের শান নিটিংয়ে দূর্ঘটনায় মারা যায় ২৩ জন। স্পেকট্রাম ভবণ ধ্বসে মৃত্যু হয় ৮০ জন শ্রমিকের। ২০০৬ সালে গাজীপুরের যমুনা টেক্সটাইল মিলে অগ্নিকান্ডে ৬ জনের মৃত্যু হয় এবং চট্টগ্রামের কেটিএস কম্পসিটে অগ্নিকান্ডের শিকার হয়ে মারা যায় ৬২ জন। এছাড়া সায়েম ফ্যাশনে দূর্ঘটনায় আরো ৩ জন মারা যায়।

২০১০ এ গাজীপুরের গরীব এন্ড গরীব সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে দূর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা যায় ২৫ জন। ভুল অগ্নি সংকেতের কারণে হুড়োহুড়িতে গাজীপুরের ম্যাট্রিক্স সোয়েটারসে মারা যায় ১জন এবং ঢাকাস্থ হামীম গ্রুপের স্পোর্টসওয়্যার ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকান্ডের শিকার হয়ে মারা যায় ২৪ জন। ২০১২ তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকান্ডে মারা যায় ১১১ জন। ২০১৩ সালে স্মার্ট এক্সপোর্ট কারখানায় অগ্নিকান্ডে প্রাণ হারায় ৭ জন। সাভারে ভবণ ধ্বসে সরকারি হিসাবে ১,১২৭ জন শ্রমিক প্রাণ হারায়। এছাড়াও বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টের দেয়া তথ্যমতে, ২০০৬ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে ২১৩ টি কারখানা দূর্ঘটনায় ৪১৪ জন গার্মেন্টস শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

তবে ১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২১৪ টির মতো অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে যাতে ৭০০ শ্রমিক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছে। এমন তথ্য গার্মেন্টস মালিক সংগঠন বিজিএমইএ এবং অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনগুলোর দেয়া পরিসংখ্যান সূত্রে পাওয়া গেছে।

শ্রমিক স্বার্থ নিয়ে কাজ করা একাধিক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন থেকে হতাহত শ্রমিকদের ন্যায্য ক্ষতি পূরণ আদায়ের দাবি জানিয়ে আসলেও এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় তা সুকৌশলে এড়িয়ে যায়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফেডারেশনের সভাপতি মোশারেফা মিশু যমুনা নিউজকে বলেন, শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বেপারে বিজিএমই থেকে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এবং সরকারও যে ধরণের ভুমিকা রাখা দরকার ছিল তা রাখেনি। আইন অনুযায়ী কর্মস্থলে দূর্ঘটনা ঘটলে নিয়োগকর্তাই সকল ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা। আই্এলও’র নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যান্ডগুলো ক্ষতি পূরণ দিবে; কিন্তু আমাদের মালিকরা যেখানে ক্ষতিপূরণ দিচ্ছেনা তাহলে বিদেশীরা কিভাবে দিবে? আইএলও’র মত যদি বিজিএমই সঠিক উদ্যোগ নিত তা হলে ব্যান্ডগুলো থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব হত। শ্রমিক হতাহতের এ দায় শিল্প মালিকদের এবং সরকারের। তিনি বলেন, আমি গত মাসে ইউরোপের বিভিন্নস্থানে অনুষ্ঠিত সেমিনারে গার্মেন্টস মালিক ও বায়ারদের বিচার দাবি করেছি। এখনো কারখানাগুলোতে অপ্রতুল নিরাপত্তা ব্যাবস্থার মধ্যেও শ্রমিকরা কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সংগঠনের হিসেবে গার্মেন্টস দূর্ঘটনায় ২১২৯ জন হলেও বাস্তবে এ সংখ্যা ৩ হাজারের উপরে এবং স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করেছে ২ শত জনের উপরে। যারা কখনো কাজ করতে পারবেনা। মৃত এবং স্থায়ী পঙ্গু শ্রমিকদের জন্য আমরা ৪৮ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছি। আশা করি সরকার ও বিজিএমই অতি দ্রুত শ্রমিকদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিবে।

জানতে চাওয়া হলে বিজিএমইর সভাপতি আতিকুল ইসলাম যমুনা নিউজকে বলেন, ইতোমধ্যে আমরা নিহত শ্রমিকদের ৭ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিয়েছি। আহতদের চিকিৎসা দিচ্ছি এবং তাদের পরিবার কে প্রতিমাসে ৪ হাজার টাকা করে দেয়া হচ্ছে। প্রায় ৮০ জন ছাত্র-ছাত্রীকে শিক্ষার খরছ দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া বিদেশী বায়ারদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে কাজ করে যাচ্ছে বিজিএমই ।

About The Author

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *