Select your Top Menu from wp menus
Last updated: 29/03/2021 at 10:14 PM | আজ বুধবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১ বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১ রমজান, ১৪৪২ হিজরি
শিরোনাম

শিবগঞ্জে নেপিয়ার পাকচং ঘাস চাষে সবুজের বিপ্লব ঘটেছে

ইমরান আলী : থাইল্যান্ড থেকে আমদানীকৃত নেপিয়ার পাকচং ঘাস চাষ করে এলাকায় সাড়া ফেলেছেন এক চাষী। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার চৌমোহনী এলাকার আব্দুল লতিফ ওরফে আলতাফ মাস্টারের ছেলে ভ্যাট কাস্টমস এক্সাইজ বিভাগের অবসর প্রাপ্ত কাস্টমস সুপার আনোয়ারুল হক এই ঘাস চাষ করে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। কম খরচে ও কম শ্রমে অধিক ফলন হওয়ায় এবং অধিক লাভ জনক হওয়ায় এই ঘাস চাষে এগিয়ে আসছেন অন্যা চাষীরা। ধীরে ধীরে এই ঘাষ চাষ ছড়িয়ে পড়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলা ও শিবগঞ্জ উপজেলায়।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কৃষিতে অনুরাগী চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার চৌমোহনী এলাকার আব্দুল লতিফ ওরফে আলতাফ মাস্টারের ছেলে ভ্যাট কাস্টমস এক্সাইজ বিভাগের অবসর প্রাপ্ত কাস্টমস সুপার আনোয়ারুল হক ঘাস চাষ করেছেন। তিনি জানান, ২০১৬ সালে ২য় কেন্দ্রীয় গো-প্রজনম ও দুগ্ধ খামার সাভারে গিয়ে সেখান থেকে আমদানীকৃত থাইলান্ড এর নেপিয়ার পাকচং ঘাসের কাটিং সংগ্রহ করে ঐ বছরের জুন মাসে প্রথমে ৪ বিঘা ও পরে আরো ১১বিঘা জমিতে এ ঘাসের চাষ করে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেন। চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি জানান, ২০১৭সালে জেলা প্রাণী সম্পষদ অধিদপ্তরের আয়োজনে পুষ্টি উন্নয়ন ও প্রযুক্তি প্রকল্পের প্রশিক্ষণ অনুযায়ী জমিতে হালকা চাষ দিয়ে সমতল করেছি। পরে জমিতে প্রয়োজনমত জৈব সার বা গোবর, অল্প পরিমান ডিওপি সার প্রয়োগ করে আবারো একবার চাষ দিয়ে প্রায় ৩৫সেন্টিমিটার পর পর ছোট ছোট গর্ত করে কাটিংগুলোকে খাড়া (সোজা) করে রোপন করেছি। এক সারি হতে অন্য সারির দুরত্ব ৭০ সেন্টিমিটার। রোপনে পর হালকা সেচ দিয়েছি। ২৮/৩০দিন পর প্রথমবার কেটেছি।
এরপর থেকে প্রতি ২০দিন দিন পর পর কেটে নিই এবং হালকা সেচ দিই। বর্তমানে প্রতিদিন ৩’শ আঁটি করে ঘাস সদর উপজেলার চৌমোহনী, বটতলা ও নতুনহাটে পাইকারী ৮টাকা দরে বিক্রী করে প্রতিদিন ২ হাজার ৪’শ টাকা আয় করছি। তারা আবার আঁটি প্রতি ১১টাকা দরে বিক্রী করেন। শুধু তাই নয় এ ঘাস দিয়ে জেলার আমনুরা রোডে পাওএল নামক স্থানে শঙ্কর জাতীয় ১৫টি গরুর খামার তৈরী করে অতি অল্প খরচে অতিরিক্ত লাভবান হয়েছি।
জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নাধীন পারচৌকা গ্রামের ঘাস চাষী সাদিকুল ইসলাম জানান, এক বছর আগে পল্লী প্রাণী চিকিৎসক আব্দুল মান্নান (লিটন)এর পরামর্শ ক্রমে উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার সুব্রত কুমার সরকারের সাথে যোগাযোগ করে নেপিয়ার পাকচং ঘাস চাষে আগ্রহ প্রকাশ করি। তিনি আমাকে বিনামূল্যে প্রায় ১’শ টি কাটিং দেন এবং হালকা প্রশিক্ষণ দেন। সে মোতাবেক আমি ২ কাঠা জমিতে রোপন করি। সে থেকে বর্তমানে ১৫ কাঠা চাষ করেছি। এখান থেকে আমি ২টা গরু পালন করছি। তাতে আগের চেয়ে প্রতিদিন গরুর খাবার বাবদ খরচ কমেছে ২’শ টাকা। অর্থাৎ প্রতিমাসে আমার খরচ কম হচ্ছে ৬ হাজার টাকা।
আগের চেয়ে প্রায় ২লিটার করে দুধও বেড়েছে। তিনি আরো জানান, আমার প্লট থেকে ঘাসের কাটিং ১০/১২জনকে দিয়েছি। তাতে আমাদের মাঠেই প্রায় ৬ বিঘা জমিতে এ ঘাসের চাষ হচ্ছে। একইভাবে উপজেলার শিবগঞ্জ পৌরসভার দেবীনগর গ্রামের জাকারিয়া বলেন, গত বছর গরুর চিকিৎসা করাতে এসে উপজেলা প্রাণী সম্পদ অফিসারের নিকট হতে নেপিয়ার পাকচং ঘাস সম্পর্কে হালকা প্রশিক্ষন ও উৎসাহ পেয়ে এবং তার নিকট হতেই প্রায় ১শ কাটিং বিনা টাকায় পেয়ে প্রথমে সামান্য জমিতে তাদের দেয়া প্রশিক্ষন অনুযায়ী রোপন করি। অল্পদিনের মধ্যে এর সুফল পেয়ে পর্যায়ক্রমে এখন ২ বিঘা জমিতে চাষ করি। বছরে ১০ বার কাটতে হয়। আমার ১০টি গরু আছে। প্রতিটি গরুর জন্য খড় ক্রয় বাবদ খরচ হতো ১ হাজার টাকা। প্রতিদিন ৩০কেজি করে দানাদার খাবার ক্রয় করতে খরচ হতো ৯’শ টাকা করে।
অর্থাৎ প্রতিদিন খরচ হতো ১হাজার ৯’শ টাকা। এখন খরচ হয় ২৫ আঁটি খড় ও ১৫কেজি দানাদার খাবার, যার মূল্য সাড়ে ৫’শ টাকা। প্রতিদিন আমার খরচ কমেছে সাড়ে ১ হাজার ৩’শ টাকা। অন্যদিকে এ ঘাস গাভীকে খাওয়ানোর পর থেকে প্রতিটি প্রতিটি গাভীর ২কেজি করে দুধের পরিমানও বেড়েছে। তিনি আরো জানান, আমার কাছ থেকে অনেকেই বিনা টাকায় কাটিং সংগ্রহ করে এ ঘাসের আবাদ করে সাফল্য অর্জন করছে।
এব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডাক্তার সুব্রত কুমার সরকার জানান, ২০১৬সালে ঢাকার সাভারে নেপিয়ার পাকচং ঘাসের উপর দুইদিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে ঐ অফিস থেকেই মাত্র ২৫টি কাটিং সংগ্রহ করে আমার অফিস চত্বরে রোপন করি। তারপর গত ২০১৭সালে প্রাণী পুষ্টি উন্নয়ন ও প্রযুক্তি প্রকল্পের জন্য দুই দফায় ১’শ জনকে এ ঘাসের উপর প্রশিক্ষণ দিই। সেখান থেকে এ ঘাসের চাষ ব্যাপক হারে সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে শিবগঞ্জ প্রায় ২’শ চাষী ২৫ একর জমিতে এ ঘাসের চাষ করে ব্যাপক হারে সাফল্য অর্জন করেছে। চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এ ঘাসের চাষ পদ্ধতি অত্যন্ত সহজ এবং খরচ অত্যন্ত কম। জমিকে সমতল করে দুইবার চাষ দিয়ে লাইন থেকে লাইনে ৭০ সেন্টিমিটার এবং কাটিং থেকে কাটিং এ ৩৫সেন্টিমিটার দুরত্ব রেখে রোপন করতে হয়। এভাবে চাষ করতে হেক্টর প্রতি ২৬ হাজার কাটিং এর প্রয়োজন হয়। গোবর বা জৈব সারই যথেষ্ট। তাছাড়া এ ঘাসকেই কচি অবস্থায় কেটে চাষ দিয়ে ঢেকে দিলে উৎকৃষ্ট জৈব সারের কাজ করে। তিনি আরো জানান, আমরা চেষ্টা করছি বাণিজ্যিকভাবে শিবগঞ্জ উপজেলার সর্বত্র এ ঘাসের উৎপাদন বাড়াতে চাষীদের মধ্যে উৎসাহ ও উদ্দীপণা সৃষ্টি করতে। তিনি বলেন এঘাস অত্যন্ত পুষ্টি মানের, রোগ প্রতিরোধকারী ও উচ্চফলন শীল।
এ ব্যাপারে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা আনন্দ কুমার অধিকারী জানান, নেপিয়ার পাকচং ঘাস পুষ্টিমানে সমৃদ্ধি হওয়ায় এ ঘাসের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ঘাস উৎপাদনে উৎসাহিত করার জন্য শতাধিক চাষীকে প্রশিক্ষন দেয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, এ ঘাস উৎপাদনে বেড়া ছাড়া বিঘা প্রতি ৫/৬ হাজার টাকা খরচ হয়।

About The Author

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *